Showing posts with label দশম সংখ্যা. Show all posts
Showing posts with label দশম সংখ্যা. Show all posts

June 30, 2019

দহর ১০ম সংখ্যা


প্রকাশিত হলো
দহর ১ম বর্ষ ১০ম সংখ্যা (জুন ২০১৯) :



প্রচ্ছদ : কৌশিক সরকার

সূচিপত্র

কবিতায় :

সিদ্ধার্থ সিংহ, চন্দন দাস, কাজী রুনালায়লা খানম, সুমন কুণ্ডু, দেবযানী ভট্টাচার্য্য, জয়ন্ত দেওঘরিয়া, পলাশ চৌধুরী, আবদুস সালাম, রঘু জাগুলীয়া, রিমলী বিশ্বাস, তনিমা হাজরা, মোনালিসা পাহাড়ী, অতনু টিকাইৎ।।

কবিতা বিষয়ক প্রবন্ধে :

অভিজিৎ দাসকর্মকার, অভিষেক ঘোষ।।




সম্পাদকীয়

   


একদিকে গ্রীষ্মের প্রচণ্ড দাবদাহ অন্যদিকে দেশ জুড়ে তীব্র জলকষ্ট! উভয়বিধ এই সঙ্কট আজকে আমাদের সামনে - আমাদের রেখে যাওয়া ভবিষ্যৎকাল সম্পর্কে ভাবতে ও ভাবাতে বাধ্য  করছে। কিন্তু ভবিষ্যৎ তো অনেক দূরের, এই সমস্যা আজকের জন্যই জ্বলন্ত হয়ে উঠেছে- এ কথা আজ সর্বজনস্বীকৃত। কিন্তু এই পরিস্থিতির জন্য আমরা নিজেরাই দায়ী, এটাই চিরসত্য। নিজেদের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য আমাদের বেহিসাবি আচরণ আজ আমাদেরই কাঠগড়ায় তুলেছে। তাই এই কঠিন সময়ে কবিতা চর্চা অনেকের কাছে বাতুলতা মনে হতেই পারে, কিন্তু আমরা সেই চিন্তাকে শ্রদ্ধার সঙ্গে উপেক্ষা করে বিনয়ের সঙ্গে জানাচ্ছি যে, একমাত্র কবিতাই আবহমান মানুষকে যথার্থ শান্তির সন্ধান দিয়ে এসেছে। তাই আজও কবিতা আমাদের পরম বন্ধু। আমাদের সবার আত্মার আত্মীয়। যে বেহিসাবি আচরণ জীবনকে বিড়ম্বিত করে সেই বেহিসাবি পদচারণা কবিতার অন্দরে সমূলে উৎপাটিত হতে বাধ্য, আর বাধ্য বলেই আজকের কবি সোচ্চারে বলে ওঠেন গাছ আর জমির পর্ণমোচন জোনাকির আলোটাকে কটাক্ষে চিনিয়ে দ্যায় মরুভূমির শীৎকার।  তবুও আদিম অভ্যাসের কাছে পৃথিবী পরাজিত না হয়ে বুঝিয়ে দ্যায় ছায়াও আমাদের গৃহকাব্য।

ফ্লুরোসেন্ট আহ্লাদে ভেসে যাওয়া শাহরিক সুখ কবিকেই সর্বপ্রথম ব্যথিত করে। 'দহর' আজ সেই সত্যকেই আপনাদের সামনে তুলে ধরছে। আমাদের বিনীত আর্জি অযথা গাছ কাটবেন না, পুকুর ভরবেন না। ইঙ্গিতের জন্মরেণু স্নায়ু বরাবর ছড়িয়ে ছুঁয়ে আছে নদীটির পাড়ে। বস্তুত জন্মদাগের জঠর থেকে উঠে আসা বাউণ্ডুলে ক্ষুধা টুপটাপ মাটিতে গর্ভসঞ্চারের প্রাক্কালে লাউয়ের মাচায় জড়ো হয়ে থাকা শিশির সঙ্গমের গন্ধে মাতোয়ারা হয়ে ওঠে। ইমোশন ক্লিক করে ভালোবাসা ফিরে আসে কোমল স্পর্শে ঘাসের  নিজস্ব কক্ষপথে, গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি যেমন শরীর ভেজায় একসময় ঠিক তেমনই মন ভেজাবে ইচ্ছেগুঁড়ি। এই ইতিবাচক প্রত্যাশাই আমাদের সবার মধ্যে জাগ্রত হোক। অক্ষর সাধনার অমোঘ তৃষ্ণার যে স্বাক্ষর এই সংখ্যার কবিরা আপনাদের সামনে রেখেছেন তাঁদের প্রত্যেককেই যথাযোগ্য সম্মান জানিয়ে প্রত্যেকের সৃষ্টিকে পাঠকের দরবারে উন্মুক্ত করা হ'ল।
                                 
৩০.০৬.২০১৯                  ভালোবাসায় ধন্যবাদান্তে
শান্তিপুর, নদিয়া            সুতনু হালদার ও সৌরভ বর্ধন
                                           সম্পাদকদ্বয়, দহর




পলাশ চৌধুরী


ফ্রন্টফুট

আমাদের কোনো ইউনিফর্ম লাগে না
চৌকো বারান্দা দেখলেই প্রণাম করি।আর...
নিজের প্রতিটি আবিস্কারে একপালক চুমু দিই ঘেন্নাও।
অতিভুজ অতিভুজ খেলা চলে
স্কেল দিয়েই তো একদিন বানিয়েছিলাম এক্সেলেটর।


জনন

মেঘ তো বৃষ্টির আগের নাম
যতবার জল হয়
আমি বাতাসের সাথে উচ্চতা ও মেঘের মৈথুন ভাবি,
বৃষ্টি এর পাগসিদ্ধ সমেহনী বীজ।
টুপটাপ ঝরে পড়ে মাটিতে
মা-টির গর্ভসঞ্চার হয়
তিকতিকে সবুজ জন্ম নেয়
প্রাণীরা প্রসাদ ভাবে সরল উপভাষার।



চন্দন দাস


যাপন

শূন্যের ভেতর বেঁচে থাকাটাই জীবন
এমনটা হতে পারতো, যদি
কৌনিক দূরত্ব টেনে চিনিয়ে দিতে পারতাম
মায়া ও মধ্যম আসলে অসুখ পোশাক ।

বহুবার ভেবেছি এই সহজসুলভ বস্তুটি
না জাগতিক; না অপরিমিত ক্রাইসিস..

ধরাযাক নগন্যতম ছায়া মাড়িয়ে বানপ্রস্থ যুগের
এক সন্ন্যাসী চলেছে মাটির রহস্য খুঁজতে
পা থেকে মাথা পর্যন্ত তল্লাশি চালিয়ে যাচ্ছেন
আকাশ থেকে এক বাজপাখি লক্ষ্য করল
অাদিম অভ্যাসের কাছে পৃথিবী পরাজিত

                              শূন্য থেকে শূন্যতায় ফিরতে...
যেভাবে কালজয়ী বিপ্লব এখনো আলোকবর্ষ দূরে



ছায়াপথ

যেভাবে সূর্যাস্তের চিহ্ন রেখে ডুবে যায় দিন,
ঢেউ গুনতে গুনতে পেরিয়ে যাই শীতের শহর

শান্ত বেড়াল ছানার মতো পরাজিত থেকে
অপেক্ষা করতে শেখায় মিনমিনে শোক

এই সমস্ত সংক্রামন ভুলে
পৃথিবীর সমস্ত নক্সা নিয়ে বাবা'র হাতঘড়ি উল্টে দেখি
একটা সামান্য বিন্দু'র ওপর  ঘুরে চলছে                                                আমাদের ছায়া ও গৃহকাব্য।



সুমন কুণ্ডু


বই-দিবসে তোমাকে
       
তোমার জুবানের কাছে গোটা একটা দিন নতজানু । উচ্চারণ থেকে বিচ্ছুরিত হচ্ছে ধারণা । অনুভব অনুভব। সুদীর্ঘ টানেল ! চৌরাস্তা নিয়ে, সাদা-কালো নিয়ে তোমার জার্নি ! আমাকে জানতে হবে তোমার সিঁথির চারপাশটুকু । আগুন । স্পর্শ তোমার, নমনীয়তা ।

 ইঙ্গিতের জন্মরেণু স্নায়ু বরাবর ছড়িয়ে দিচ্ছে মায়াপেখম । তুমি খুলে দিয়েছ অক্ষরের বুক, উস্কে দিচ্ছ ! এই ক্লিপিংস নট অ্যাট দ্য ফার্স্ট সাইট , ঘুম সরিয়ে ভালোবাসতে চাইছে কেউ ।



রিপিটিশন

মে মাস চোখে ভেসে আসছে বারবার । এক এর পিঠে নয় - উনিশ - একটা তারিখ । অ্যারাইভাল, এন্ট্রি ! তুমি আলোচনা হয়ে উঠছ ।

পক্ষপাতদুষ্ট মন ঘড়ি দেখছে । ঘাড় ঘুরিয়ে দেখছে রোদ আর রোদ । রোদের থেকে দূরে পাখিদের উড়ান । তোমার সালোয়ারের মাপে ছায়া লম্বা হয়ে এগিয়ে আসছে এদিকে মাধ্যাকর্ষণের মতো ! এই তো ছন্দ এবং ঋতু, প্রান্ত লোপাট করা । আঙুলের দাগ দাগ । তুমি অপেক্ষা ছিঁড়ে লিখে দিচ্ছ সম্মতি, লিখছ সম্পর্ক ।


রঘু জাগুলীয়া


বিষাদপঙ্ক্তি

এই যে হৃদয় নামক নির্জন উপত্যকায়
কি পাবে তুমি এলে?
সপুষ্পক রজনীতে মেঘ গলে ফোঁটা ফোঁটা 
ইচ্ছেকনা হাওয়ায় ভাসবে
বেশীদূর সে ভেসে যেতে পারে না।
অন্ধকার একাকী হাঁটার সময়
একটা জ্বলন্ত বিষাদ ফুটিয়ে তোলে মাথায়
আলোকবর্ষে সঙ্গাহীন ঝিঁ ঝিঁ'র কথোপকথন
যেন মহাশূন্যস্হানকে টেনে টেনে বয়ে 
চলেছে নিওলিথ যুগের এক প্রেমিক,
তাঁর আর্দ্র দুচোখে ঝরছে বিষাদপঙ্ক্তি
তাঁর চারপাশে নিঃসঙ্গতার বেড়া।
তাকে ছুঁয়ে দিলে তুমি জোনাকী হবে... 


মৌসুমীপ্রবণ

পরিযায়ী পাখির ঋতুযান আছে
এলোকেশ থেকে চুঁইয়ে পড়ে সন্ধের অবগুন্ঠন।

বিষন্ন পথের দুয়ার খুলে এক ফেরিওলা এল বাড়িতে
সেই ছিল আমার প্রথম বাউল দেখার নেশা
সে গান গাইতো না
তার কর্কশ স্বর মাটিকে বলা
 তার হাতে চলে যায় আমাদের ভাঙাচোরা জীবন...

সেই যে জীবন!
যে জীবনকে সময় দস্যুর মতো গিলে নিচ্ছে
যে জীবনকে শুধু মেঘের পর মেঘ পেরোতে হয়।

সেই জীবনের মাঝে সহসা তুমি এলে
যেন অনন্তের অবয়ব দেখতে গেলাম ছুটে
দিবানিশি তারপর থেকে ভিজছি...








সিদ্ধার্থ সিংহ


হলুদ পাঞ্জাবি

ফেসবুকে ঘন ঘন হলুদ পাঞ্জাবি পরা আমার ছবি দেখে
আপনি বলতেই পারেন,  দাদা, এ বার অন্য একটা পাঞ্জাবি পরুন…
আমিও লিখতে পারি---
আলমারি থেকে বের করে দেওয়ার তেমন কেউ নেই যে!
আসলে ওই পাঞ্জাবিটা আমার বড় পয়া…
যে দিন ওটা পরে গিয়েছিলাম
সে দিনই তিনি আমাকে প্রথম ‘হ্যালো’ বলেছিলেন
তপন থিয়েটারে আমার গণ সংবর্ধনার দিন
ওই হলুদ পাঞ্জাবিটা পরেছিলাম দেখেই
উনি আমার পাশের সিটে এসে বসেছিলেন
ওই হলুদ পাঞ্জাবিটা পরেছিলাম বলেই
ফেসবুক খুলতেই দেখি তাঁর প্রথম লাইক
এখন আমার দৃঢ় বিশ্বাস
ওই হলুদ পাঞ্জাবিটা পরে থাকলে
শুধু আনন্দ নয়,  জ্ঞানপীঠ নয়,  নোবেল পুরস্কারও নয়
তার চেয়েও তার চেয়েও তার চেয়েও
অনেক বড় পুরস্কার আমি অনায়াসে পেয়ে যেতে পারি
উনি নিজে থেকেই হয়তো কাছে এসে বলতে পারেন---
কেমন আছেন?  ভাল তো?


টপ ফ্লোর

নয়নাদি,
আপনি এখন কোথায়?

টপ ফ্লোরে। বসের ঘরে।

ছুটি হয়ে গেছে তো…
যাবেন না?
না কি ওখান থেকে
ঝাঁপটাপ দেওয়ার মতলবে আছেন?

আমি ঝাঁপ দেওয়ার লোক নই।
বস নিজেই ঝাঁপ দেন
আমার উপরে।

ছিঃ! এই ভাবে কত দিন চলবে?

যত দিন না প্রেগন্যান্ট হই
তার পর…
বস আর ঝাঁপাবে না
তখন হয়তো আমিই ঝাঁপ দেব
এই টপ ফ্লোর থেকে।



জয়ন্ত দেওঘরিয়া


এক নামহীন শুষ্ক ভূমিতে

যে শরীরে থেকে তুমি খুঁজেছো বিকৃত কঙ্কাল স্তুপ
তার ভিতর একটা আস্ত সভ্যতার ধ্বংসাবশেষ।
সেই শরীরের ভাঁজ দেশে মৃত ইতিহাস!
পোড়া ইটের সাজানো বাড়ি আজ ভগ্নস্তূপ
সময়ের ঘোরাটোপে আত্ম বিক্রি হয়ে খোরাক চালায় যে দেহ তার পশ্চাদ্ভাগ ফালি ফালি— তেলচিটে কাপড় ঢাকা ‌
জন্ম দাগের জঠর হতে উঠে আসা বাউন্ডুলে ক্ষুধা ধর্ম উপাস্য দেবতা খুঁজে।
সমাজের স্তনের নরম মাংসপিণ্ডে পালিত একজন পুরুষ ক্রমে ব্যর্থ হয় নামহীন কোন ক্রন্দনরতা মরুভূমির পাঠোদ্ধার করতে!
আর অর্ধ শুষ্ক মরূদ্যানের তলপেট ঘিরে কালপুরুষের ঝাঁকের ভিড়।




রিমলী বিশ্বাস


রি-সেট

নোটিফিকেশন আসে তীব্রতায়
স্ক্রিনে ফ্লুরোসেন্ট আলো,
আড়াল নেই!
জীবন এখন এরকমই!

সাইক্রিয়াটিস্টের
লাস্ট ডেটটা মিস হল,
লাস্ট পিরিয়েডেরও!

না, এভাবে নয়...
মানসিক রোগ নিয়ে
শরীরী হওয়া যায়,
শস্য আনতে নেই...
আরেকটা অ্যাপয়েনমেন্ট ফিক্স
করতে হবে...রক্তপাতের!

যেমনটা রোজ বিছানায় ঘটে!
আত্মঘাতী বিস্ফোরণ...
ভালোবাসা ফুরোলে শরীরে আগুন
ছাড়া কিচ্ছু থাকেনা...

পোড়া দাগ আরও গাঢ় হয় অন্ধকারে!


নেট-সার্চ 

অবান্তর জেব্রা-ক্রসিং!
লন টেনিসের স্কোরবোর্ড
আটকাতে পেরেছে
মনিকা সেলেসের পিঠের ছুরি!

ওসব কিচ্ছু নয়...
স্পার্ম কাউন্ট ঠিক থাকলেই
আজকাল যে কেউ ভিকি ডোনার!

যে কেউ বয় ফ্রেন্ড...
যে কেউ পার্টনার
বিজনেসে বা বিছানায়...
তারাই শরীর ঘাঁটতে ঘাঁটতে
গুলল ঘাঁটে...
'ইমোশন'-এ ক্লিক করে আঙুল!



মোনালিসা পাহাড়ী


কক্ষপথ

কালো মনের আঙিনায় ঢাঁকা পড়ে
আলোমাখা ঝাঁচকচকে রাস্তার সুখ উন্মোচিত সামিয়ানা
অগোচরে ধুলো জমে বেড়ে ওঠা বেনামি গাছ
বুক পেতে শুনতে চায় কালো মনের আর্ত হাহাকার।
আপাত দৃশ‍্যত জাগতিক আনন্দধারায়
বড় বেমানান হয়ে গা বাঁচিয়ে চলে অলস পায়ের তেইশের যুবক-
চাপ দাড়ি আঁকড়ে বসে থাকে ব‍্যার্থতার কণা কণা মেঘ।
বড় বড় লাল চোখ অবনত হয়ে খোঁজে পায়ের তলার মাটির হদিশ....
তারপর রাজপথ ভেঙে অলিগলি ঘেঁষে ধানক্ষেত
বয়ে যাওয়া শীর্ণকায়া নদী তাকে নিয়ে যায় নিরুদ্দেশে,
মুগ্ধ প্রদীপের শিখায়, মায়ের আঁচলের নরম প্রলেপে
কুঁড়ে ঘরের পরম নির্ভরতায়
ধুলোবালির মাটির পৃথিবীর ছোঁয়ায়,
কোমল ঘাসের স্পর্শের আলাপনের মধুময়তায়-

এভাবেই আঁধার সাঁঝের বিলিয়মান সূর্যের পথ ধরেই
সে ফিরে আসে আপন কক্ষপথের নিজস্বতায়।




অতনু টিকাইৎ


শেকল

তারপর একদিন তোর খবর জানতে, ইচ্ছে হবে।

গুড়ি-গুড়ি বৃষ্টি যেমন শরীর ভেজায় একসময়
ঠিক তেমন ভাবে, মন ভেজাবে ইচ্ছে-গুড়ি।

তেষ্টা যেমন স্থিরতা খায় রাজার মতো
তেমন ভাবে তোর তেষ্টা, খাবে আমার দাম্পত্যসুখ।

তারপর একদিন তোর কাছে যেতে ইচ্ছে হবে
আর হঠাৎ করে টের পাব, পা'য়ে শেকল টান



কাজী রুনালায়লা খানম


'অন্ধকারের উৎস হতে '

কতকিছু রেখেছি গুছিয়ে নিজস্ব গভীরে
আলোর উৎসব
অগণন প্রসাধিত মুখ
ফ্লুরোসেন্ট আহ্লাদে ভেসে যাওয়া শাহরিক সুখ।

দেখেছি আলোর নীচে বসে থাকা বিদগ্ধ আঁধার
বয়স্ক ত্বকের বলিরেখা, খড়িওঠা শীর্ণ হাত,
ক্ষয়াটে সময়ের শূন্য চোখে
জমে আছে হিম হিম কুয়াশাপরত।

শুকতারা সাক্ষী রেখে
ভোরপথ হেঁটে যায় যে অনাম্নী বৈষ্ণবী

           যেতে যেতে
                           চলা থামিয়ে
                                            একবার

মানুষের পাশে এসে বসে
দুদন্ড জিরিয়ে নেয় মানুষের বুকের ছায়ায়।

আমিও ভাঙনের কিনার থেকে
বুকে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়াই
সটান ছুঁড়ে দিই,
এইসব বিজ্ঞাপিত সংলাপ
রোশনাই... নহবত... আয়োজন...

নিশিডাকের মতো ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাই
শিশিরভেজানো পায়ের ছাপ।
আমার আজন্ম  হা- ভাতে শব্দেরা
মৃদু পায়ে হেঁটে আসে
             মিশে যায় মানুষের ভীড়ে।
আমার ভেতর বাইরে তখন
             অন্য এক উৎসবের আলো,
                            আশ্চর্য বোধনের সুর।

ফিরে আসি নিজস্ব গভীরে
মোহান্ধ আগল খুলে দেখি চোখের নিহিত জলে
একশো আট নীলপদ্ম ফুটে আছে।



আবদুস সলাম


প্রেম

সাপ রঙা  রাস্তায়  শুয়ে আছে রোদ্দুর
ফুল রঙের কষ্টরা  উষ্ণতা কুড়ায়
অভিজ্ঞতার বিষন্ন-ফুল তুলে রাখি  সংকোচে

পাপড়ির ভাঁজে ভাঁজে জমা আছে উৎসব

ঘুঘু ডাকা প্রহরে কষ্টরা হেসে ওঠে
দাঁড়ি কমা সেমিকোলন নিয়ে আদিক্ষেতা দেখিয়ো না প্লিজ্
লাউ-এর মাচায় জড়ো হয়ে আছে শিশির সঙ্গমের গন্ধ

বিষন্ন বিকেল খুঁজে রাখে হ্যানিমুনের পাসপোর্ট


দেবযানী ভট্টাচার্য্য


ফেরা যাক

যেতে হবে , ওঠা যাক তবে-
হাট ভেঙে গেছে, সারসার লন্ঠন
ফিরে গেছে পাহাড়তলীতে ।
যতখানি  আলো ছিল ঘাসের শরীরে, ততখানি শান্ত  মলিনতা ছুঁয়ে আছে নদীটির পারে ।

এখন ফেরার পথ, হেমন্তের গর্ভিণী  মাঠ-
তোমার শরীর থেকে  উঠে আসা আতপের ঘ্রাণ।
অনড় দুঃখের মত কিছু কিছু অনুচ্চার কথা শিশিরে শিশিরে মিশে থাক।

এখন ফিরতে হবে শূন্য  জানলায় ,
মুখোমুখি  আদিগন্ত কুয়াশার  রাত-
অভিমানী  নক্ষত্রের মুখ ।
স্মৃতিনদী বাঁক নেয় স্বেচ্ছা নির্বাসনে।

এখন হেমন্ত  এলে হিম হাত স্পর্শ  খুঁজে ফেরে-
এখন ফেরার পথে--
নিদ্রিত সাঁকোটির নীচে
মৃত স্বপ্নেরা ভেসে যায়



ত নি মা হা জ রা


চাতক জল

তোমারি অভিপ্রায়  নৈবেদ্য দিয়ে  বসে আছি,
তিলমাত্র সুখ থেকে দূরে স্বেচ্ছায় চলে গেছি উড়ে,
আমার রঙ্গিন কাগজ দেহ,মিটিয়ে বাতাসের দায়ভার  মোহ
চাও যদি, মুক্তি মাখতে পারে সারা গায়।

এইসব রংছোপ সামিয়ানায় ভরন্ত সুখ দেয়ালা ছিল যার রোজদিন,হাফগেরস্ত সে এখন,স্বনির্বাচিত বাউন্ডুলে মন,
হতে পারে  নিমেষেই আলাদীন, মায়াটান কালভার্ট পাশ কাটাই,কারো মুখে লেখা থাকে অনুরোধ,
কারো হাতে ধরা থাকে কাঠের লাটাই।শচীমাতা খুব জোরে হাঁক পাড়ে অন্দরে " নিমাই,  নিমাই "
দাক্ষিণ্য হাত উপুড় করে দিয়ে বলে,  ওরে   নাই,  নাই,  নাই।

ভালবাসা ফেলে রেখে  চৌকাঠে লক্ষীছাপ আলপনার মতো  নিঃশব্দে যারা চলে যায়,তাদের মনের কথা ঘ্রাণ হয়ে ফোটে রোজ ভোরের মাধবীলতায়।।

আমারও এই তুমিটুকুই নেহাত সম্বল,সব ঢেউ অর্ঘ্য দিয়ে  সরস্বতী নদী বালির গালিচার নীচে রেখে যাবে শুধু একটু চাতক জল।।



অভিষেক ঘোষ



কবিতা :  কেন লিখব 

কবিতা কী ? কাকে বলে ? কবি উইলিয়ম ওয়ার্ডসওয়ার্থ বলেছিলেন, “Poetry is the spontaneous overflow of powerful feelings: it takes its origin from emotion recollected in tranquility.” তাহলে শক্তিশালী অনুভূতিসমূহের স্বতঃস্ফূর্ত প্লাবন বা ভাবোচ্ছাস-ই কি কবিতা ? বোধহয় অনেকেই এই ধারণায় আস্থা রাখতে চাইবেন । কিন্তু সম্পূর্ণ নিশ্চিত কোনোদিনই হওয়া সম্ভব নয় । কারণ তা যদি হতো তাহলে সেই মুহূর্তেই কবিতা লেখার প্রয়োজন ফুরিয়ে যেত ! দেহের খাঁচায় যেমন প্রাণপাখিটির আনাগোনা কোন পথে হয়, সে সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায় না, সৈকতে ঠিক কোন মুহূর্তে সমুদ্রের তালপাকানো ঢেউ ভেঙে পড়বে তা যেমন অনিশ্চিত, যেমন অনিশ্চিত শয্যায় ক্লান্ত দু-চোখের পাতায় ভুম নেমে আসার মুহূর্তটি — তেমনি অনিশ্চিত কবিতার সংজ্ঞানির্ণয় । বাতাসে ভেসে আসা জলরেণু যখন বৃষ্টি হয়ে জলাশয়ে ঝরে পড়ে, তা সাবলীল সুষমায় কখন যেন জলে বিলীন হয়ে যায় । কবিতা-ও তেমনি, অনির্দিষ্ট অনুভূতি অব্যয় হয়ে মিশে যায় অক্ষরের শরীরে, কলমের নাভিমূলে কালি-র স্পর্শ গায়ে মেখে । কবিতা শুধু অক্ষর নয়, শুধু স্বর নয়, শুধু বক্রোক্তি নয়, শুধু ব্যঞ্জনা নয় । আবার কবিতা কেবল রীতি নয়, অনুভূতি নয়, বিষয়বস্তু নয়, প্রকাশভঙ্গি নয় । কোনোটাই নয়, অথচ সবগুলি মিলেই কবিতা । এক একজন কবির সৃষ্টিতে একেকরকম মিশ্রণ বা, কম্পোজিশন থাকে । কিন্তু কেউই কি সঠিক জানেন, কোনটি একেবারে সঠিক ? কতটা অনুভূতির সাথে ঠিক কতটা অক্ষর মিশিয়ে কতটা ব্যঞ্জনার আঁচে পদ্যের হাঁড়ি চড়িয়ে, তাতে কতটা প্রকাশভঙ্গির গোলমরিচ ছড়িয়ে দিলে, তা সঠিক কবিতা হয়ে উঠবে ? আদেও কি এমন কিছু হয় ? নাকি আমরা কেবল চেষ্টাই করতে পারি সাফল্যের স্বপ্ন বুকে নিয়ে, স্বপ্ন সত্যি হলে কবির জন্ম হবে ভেবে !


'সকলেই কবি নয়, কেউ কেউ কবি' — কথাটা বোধহয় সকলেই শুনেছেন । কবিতা লিখবো বলে বসে পড়ে শেষমেষ অনেকেই ছড়া লিখে ফেলেন । কারণ তাঁদের ধারণা চালাক চালাক অন্ত্যমিল মানেই কবিতা ! কিন্তু বিষয়টা তরল বলেই বুদ্ধি বা অনুভূতির কাছে ঐধরনের লেখালেখির কোনো আবেদন থাকে না । অনেক আবার ভাবেন আধুনিক তথা যুগপোযোগী হতে গেলে বাক্যে নয়, মন দিতে হবে শব্দে । শব্দ ব্রহ্ম একথা সত্য তবে খামোকা কঠিন তৎসম শব্দ অথবা, বিদঘুটে উপমা ব্যবহার করলেই কবিতা আধুনিক হয়ে ওঠে না । ছন্দোময় অন্ত্যমিলের দায়ভার বইতে হয় না বলে ইদানিং অনেকেই বেশ হালকা বোধ করেন । হাফরাইমে কবিতা হাঁপাতে থাকে আর কবি-ও ! কেউ কেউ ভাবেন স্মার্ট যৌনগন্ধী শব্দ নিয়ে এলেই জীবনানন্দ বা বিনয় মজুমদার হওয়া যায় ! কিন্তু যায় কি ? তাঁদের সংকট তাঁদের শব্দে বেঁচে আছে । সংকট-ও তো বহুমাত্রিক । কেবল ব্যক্তিগত হলে সেই সংকট তুচ্ছ ও নিষ্প্রাণ । আত্মিক সংকট ইতিহাসচেতনা বা সমাজচেতনায় পরিব্যাপ্ত না হলে তা কিছুতেই বৃহত্তর পাঠকের চেতনাকে স্পর্শ করতে পারবে না । ক্ষণস্থায়ী বুদবুদের মতো শব্দের খেলা অনেক আধুনিক কবিরই একমাত্র সম্বল হয়ে পড়েছে । এটা খানিকটা হতাশারও বটে । আধুনিক গানেও তাই । কথায় কোনো দ্যোতনা নেই, নেই অর্থপূর্ণ গন্তব্যের হদিস — শুধুই চালাকি । ছল করে আর যাই হোক কবি হওয়া যায় না । এমনিতেই কবিতা কেউ পড়েন না, পড়তে চান না । অথচ সকলেই প্রায় বলে থাকেন, “কিছুই বোঝা গেলো না !” এখানেই তো মুশকিল । কবিতা যে মোটেও বোঝার ব্যাপার নয় । বুঝতে গেলেই কবিতা সিসিফাসের নিয়তি-র মতো ঘাড়ের বোঝা হয়ে ওঠে । কবিতা উপলব্ধি করতে হয়, অনুভব করতে হয় । কখনো পাহাড়ী পাকদন্ডীর হদিস দেয়, কখনো শীতের সকালের বিলাসী রোদের মত পায়ের কাছে একফালি উষ্ণতা দেয় । আবার কখনোসখনো কবিতা বৃষ্টিভেজা শহরের বিজ্ঞাপনী নিয়ন আলোর মত জ্বলতে থাকে, কখনো গ্রাম্য মাঠে নদীতীরবর্তী পলিমাটিতে সদ্য গজানো ঘাসের ওপর পা ফেলার তৃপ্তি দেয় । এসব চোখ বুজে অথবা ইন্দ্রিয়ের সমন্বয়ে অনুভব করতে হয় । ধরাযাক, থিও অ্যাঞ্জেলোপুলাস-এর Ulysses' Gaze (১৯৯৭) ছবিটি । সিনেমা-টিতে বেশ কয়েকবার আমরা দেখি নায়ক চরিত্রটি ক্রমাগত ভ্রাম্যমাণ, হন্যে হয়ে সে কিছু খুঁজছে । বেশ কয়েকবার আমরা শুনতে পাই আকাশ-পথে বোমারু বিমান থেকে বোমা পড়ার শব্দ, কিন্তু একবার বোমা পড়তে দেখি না । অথচ চরিত্রগুলি আতঙ্কের অভিব্যক্তি ফুটিয়ে তোলেন চোখেমুখে । তাহলে ? দেখতে পাই না, তার কারণ — এ হলো ইতিহাসের অভিঘাত । প্রতিধ্বনির মতো । অতীতে যা সার্বিক ধ্বংসের কারণ হয়েছে তারই প্রতিধ্বনি পরবর্তী প্রজন্মের কানে এবং চেতনায় এসে ধাক্কা দিচ্ছে । পরিচালকের কাছে সময় নিরবচ্ছিন্ন — অনন্ত অখন্ড সময়ের চেতনা । তাই এক সময়ের ঘটনা ভিন্ন সময়ের অভিযাত্রীর বুকে হিল্লোল জাগাতে পারে । জীবনানন্দ সাধে বলেছিলেন, “হাজার বছর ধ'রে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে, সিংহল সমুদ্র থেকে নিশীথের অন্ধকারে মালয় সাগরে অনেক ঘুরেছি আমি --- ” রবীন্দ্রনাথের ‘ওরা কাজ করে’ কবিতার প্রথম অর্ধে বা, বাংলাদেশের প্রণম্য সাহিত্যিক আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের উপন্যাসে এই অখন্ড পরিব্যাপ্ত কালচেতনার হদিস মেলে ।


এবার, শেষ করা যাক । কবিতা লেখা যায় কী করে ? প্রথম কথা, চেষ্টা করে লেখা যায় না । যারা যখনতখন লিখে ফেলেন, তাঁদেরও সাধনা আছে । তাঁরা বেশিরভাগই প্রচুর পড়েছেন । তাই তাঁদের ভঙ্গি-টা সহজাত হয়ে গিয়েছে, আর বাকিটুকু অভ্যাস । শ্বাস প্রশ্বাসের মতোই কবিতা আসে । তাঁরা ভাগ্যবান । তবে খাটুনি-টা আছে । আর যাঁদের ওভাবে আসে না, তাঁদের অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় নেই । স্বপ্নের মতোই কবিতা আসবে । দেখা দেবে আলোর ঝলকানির মতো, শিহরণ-জাগানো অনুভূতির মতো । হয়তো কিছু শব্দ, একটা বাক্য বা একটা সুনির্দিষ্ট ভাবনা । তারপর দরকার হয় অধ্যাবসায়ের । শব্দ নির্বাচনে দক্ষতা, স্বকীয়তা আর মাত্রাবোধ — এসব তখন খুব জরুরী হয়ে পড়ে । খুব করে না পেয়ে বসলে, সত্যিই কবিতা লেখা উচিত নয় । মাঝারি জিনিস যতো ফেলে দেওয়া যায় কবি ও সাহিত্য — উভয়ের পক্ষেই তত মঙ্গল । সিরিয়ার শিশুদের ক্রন্দন যদি আপনাকে আবিষ্ট করে, তবে অবশ্যই লিখুন । কিন্তু যদি পশ্চিমবঙ্গের বেকারসংকট মিয়ে প্রাণ কাঁদে, দয়া করে কবিতা লিখবেন না । বরং গদ্য লিখুন । কারণ সত্য-কে খুব কাছ থেকে জানা যায় না । সত্য জানতে হলে সময়ের দূরত্ব বা অন্তত মানসিক দূরত্ব প্রয়োজন । নাহলে মরীচিকায় ঘুরে মরতে হয় । সুতরাং কবিতা লিখুন নিখাদ অতৃপ্তি থেকে, লঘু বিচ্ছেদ থেকে নয় । কবিতা লিখুন দায়ভার থেকে, দায়বদ্ধতা থেকে, বিলাস থেকে নয় । হয় শব্দের বালিশে ঠেস দিন নয়তো কঠিন মাটি-তে পা ফেলুন । মাটির মালিন্য গায়ে লাগবে বটে, তবু বিশ্বাস করুন, ওই মালিন্যই পারে আপনার সৃষ্টি-কে গতানুগতিকতার লঘুতা থেকে মুক্তি দিতে । কবিতা হোক ফল্গুধারার মতো, অতর্কিতে এসে ভাসিয়ে দিক সময়ের দুর্গ, স্বর্গীয় আভিজাত্য আনতে না পারুক যেন অন্তত সময় আর মানুষ-কে তা ছুঁয়ে থাকতে পারে ।


______________

অভিজিৎ দাসকর্মকার



সম্পাদকের দৃষ্টিতে আজকের কবিতা

আমরা এই তরুন প্রজন্ম নিজেদের কোন দশকের আওতায় ফেলছি না । এই সময় কবিতা লিখতে এসে যা দেখি তাতে কবিতার অনেক উন্নতি হচ্ছে। কবিতার এই বিবর্তন বাংলা সাহিত্যেকে এক নতুন  ধরনের বিশেষ জায়গায় পৌঁছে যাওয়ার পথকে আরও সুদৃঢ় করছে। এতে আমরা নিজেদের যে শুধু বাঙালি বলে গর্ব বোধই করি তাই নয় তার সাথে আমাদের পরিচিতির জায়গাটাকে আরও ব্যপ্ত করছি নিজেরাই যেকোন দৃশ্যকে যুক্তিপূর্ণ, কাব্যিক এবং আলাদা চিন্তা ধারার মাধ্যমে।

    শ্রীকৃষ্ণকীর্তন,চর্যাপদ, পদাবলীর ধারা বা আবহমান, আধুনিক বা তারও পরে POST MODERNISM, এর মাঝে হাংরি (১৯৬১সালে মলয় রায়চৌধুরী ওসওয়াল্ড স্পেংলার এর লেখা "The Decline of the West" বইটির মূল বক্তব্য থেকে এই আন্দোলনের দর্শন গড়ে তুলেছিলেন। স্পেংলারের মতে কোনো সংস্কৃতির ইতিহাস কেবল একটি সরল রেখা বরাবর যায় না, তা একযোগে বিভিন্ন দিকে প্রসারিত হয় ; তা হল জৈবপ্রক্রিয়া, এবং সেকারণে নানা অংশের কার কোন দিকে বাঁকবদল ঘটবে তা আগাম বলা যায় না। ঔপনিবেশিক ভারতবর্ষে ডিসকোর্সের সংকরায়ণকে স্বীকৃতি দেওয়া তাঁদের কর্মকাণ্ডের অংশ ছিল । সেই কারণে ভারতে হাংরি আন্দোলন স্থায়ী হয় নি...  এবং শ্রুতিও ক্ষণস্থায়ী। শ্রুতির প্রসঙ্গে কবি উত্তম দাশ তাঁর ‘হাংরি, শ্রুতি ও শাস্ত্রবিরোধী আন্দোলন’ গ্রন্থে শ্রুতি সম্পর্কে কী লিখেছেন, দেখে নেওয়া যাক...

“শ্রুতি লেখকদের প্রধান কাজ প্রকরণগত। বিশ্বের বিভিন্ন আন্দোলন যেমন তাদের শিক্ষিত করেছে নিজের অভ্যন্তরে তাকাতে এবং দেশকাল সময়ের প্রেক্ষিতে অনিবার্য ছিল তা। সেই অবচেতন স্তরের অলৌকিক অনুভূতি লৌকিক ভাষায় প্রকাশ করতে গিয়ে বর্জন করতে হয়েছিল যাবতীয় প্রচলিত পদ্ধতি। শব্দের ধ্বনিগুণকে আবিষ্কার করলেন তাঁরা নতুনভাবে, শব্দের একক অর্থ, স্পষ্ট ও অব্যর্থ। সেই সঙ্গে শব্দের চিত্রগুণ। ভাষায় ব্যবহৃত শব্দের দুটি রূপ দৃশ্য ও শ্রব্য। শব্দের একটি উপাদান বর্ণ, ধ্বনির সাংকেতিক চিহ্ন। অর্থাৎ একাধারে সাংকেতিক ও দৃশ্যময়। ভাষা প্রচলনের পর থেকে বর্ণের এই দৃষ্টিগ্রাহ্য রূপ অবজ্ঞাত হয়েছে, তাকেই নতুন মূল্যে আবিষ্কার করলেন ‘শ্রুতি’র লেখকরা। শব্দের আর একটি রূপ হলো ধ্বনিগত, উচ্চারণে ধরা পড়ে। শব্দের এই দৃশ্যময় ও ধ্বনিময় রূপকে নবলব্ধ উপলব্ধির প্রকাশক হিসাবে প্রয়োগ, ফলত নতুন দ্যোতনা পেল শব্দ।  শব্দের অর্থগতরূপ দৃশ্য ও ধ্বনিতে উদ্ভাসিত হয়ে অনেক অগম্য বোধের সহায়ক হলো। আবিষ্কৃত হলো ভাষার নতুন মাত্রা।

এটুকু হয়ত বলাই যায়, বাংলা কবিতার অবয়বে যে দৃষ্টিগ্রাহ্য পরিবর্তন এসেছে,কবিতার পংক্তির ১৪, ১৮ কিংবা ২২ অক্ষরের ঠাসবুনোন থেকে মুক্তি পেয়ে অক্ষরবৃত্তও যে দৃষ্টিনন্দন হয়ে খেলা করছে কবিতায়। কবিতার বহিরঙ্গে যে পরিবর্তন এসেছে, তার জন্য শ্রুতির কবিদের প্রচেষ্টাকে না মানাটা অন্যায় হবে। তার্কিকরা ১৯৬৫ সালের আগে কবিতার চেহারা কেমন ছিল এবং পরবর্তী দু’এক বছরে তা কিভাবে হঠাৎ বদলে গেল ভেবে দেখবেন। বাংলা কবিতায় অমিয় চক্রবর্তী, সুভাষ মুখোপাধ্যায়কে মনে রেখে শ্রুতির কবিরা যে পথ খুঁজতে চেয়েছিলেন তাকেই হয়ত আরো সুন্দর করে তুলেছেন পরবর্তী প্রজন্মের কবিরা )।

     এক সময় দেখেছি Close ended বা একরৈখিক কবিতার ধরনের সাবলীলতা অনেক কবির মধ্যে। উত্তর আধূনীকতার উপর দাঁড়িয়ে লিখতে লিখতে বারীন ঘোষাল সেই পথ ছেড়ে দিলেও কবি প্রভাত চৌধুরী সেই জায়গায় একভাবে নিজেকে মগ্ন রাখেন। তাঁর লেখা 'সাক্ষাৎকার বা আবার সাক্ষাৎকার ' 'সুন্দরবনের কবিতা' কাব্যগ্রন্থ গুলি পড়লে বুঝি উনি আজ থেকে প্রায় ২১-২৩ বছর আগে কি অসাধারন ভাবনার জায়গায় দাঁড়িয়ে বা কি উন্নত চিন্তাভাবনায় নিজেকে বসিয়ে plot construction করেছেন বহুরৈখিকতা এনেছেন! তার কবিতায় সেই বিষয় গুলোর সুস্পষ্ট প্রতিফলন দেখতে পাই। উনি কবিতাকে আজও update এবং ডাইমেনশন দেবার কথা বলেন এবং সাধারণ বিষয়কে অন্যের থেকে আলাদা করে ভাবার কথাও বলেন।

 এখন বাংলা সাহিত্যে আরও ১টি নতুন ধারা এসেছে জিরো  বাউন্ডারি কনসেপ্ট (আফজল আলি) নামে। উত্তর আধুনিকতার পর কোনো কনসেপ্ট সেভাবে আসে নি বা কেউ এই বিষয়টার দিকে আলোকপাতও করেন নি সেভাবে। এই ধারাতে তিনি সমস্ত ধারনকে গ্রহন করেছেন। তবে নতুন কী আছে এতে? নিশ্চয় আছে। উনি কিছু বিষয়ের উপর জোর দিয়েছেন যার মধ্যে প্রথমেই বলেছেন কবিতার মধ্যে জাড্য ধর্ম বা জড়তা কাটানোর বিষয়। কারন একই রকম লিখতে লিখতে কবি সেই গতানুগতিকতায় আবদ্ধ হয়ে পড়েন। যা তারা লেখার পরিসীমাকে স্ট্যাগনেন্ট করে দেয়। তাই তিনি বলছেন যখনই এমন হবে দাঁড়াও, থামো, বসো, ভাবো, তারপর সামনের প্রাচীরকে ভেঙে নতুন করে এগিয়ে চলো।নতুন ভাবে ভাবো কবিতার দৃশ্যপট। স্ট্রাকচার ভাঙো বারবার। নিজের কবিতায় dimension চেঞ্জ করো।নতুন structure তৈরী করো যা তোমার নিজস্বতা বা signature হবে। কবিতায় hybridization আনার কথার উপর  বারবার জোর  দিয়েছেন। এমনকি উনি বলছেন কবিতাটা শুরু হলো গদ্য রূপে তবে শেষও যে ওভাবেই করতে হবে তা কেনো ছন্দ দিয়েও শেষ করাই যায়। মানে সহজ ভাবে বলতে গেলে কবিতায় এমন কিছু ধরন আনতে পারাই যায় যা কখনো আগে লেখা হয়নি।সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র লেখা। তাতে শব্দের ব্যবহার ও এমন হতেই পারে যে আগের শব্দটির সাথে পরের শব্দটির সামঞ্জস্যতা থাকতেই হবে।মানে শব্দ বা বাক্য গঠনের কোন বাঁধাধরা নিয়ম-নৈতিকতা বা ঔচিত্যবোধকে সীমাবদ্ধতার ঘেরাটোপে আটকে রাখতে হবে। এই যে ইজমটা এলো তা তাকে কবিতার প্রতি ভালবাসা,কবিতার আবদ্ধতা আর সময় করিয়ে নিয়েছেন। কবির কবিতা লেখার  বিভিন্ন স্টাইল দেখেই কখনো প্রতি para বা কখনো কখনো প্রতিটি লাইন এমনকি প্রতিটি শব্দেও Structure ভাঙা দেখেই কিন্তু একটা নতুন ইজম তৈরী হয়।কবিতা কিন্তু কোন ইজমের উপর দাঁড়িয়ে থেকে বা ভর করে লেখা হয় না,কবিতাই ইজম তৈরী করে।

              তবে এখন অনেকে সংকেত দিয়ে কবিতা লেখেন ( রাহুল গাঙ্গুলি)। আমি জানি না এর ভবিষ্যৎ কি? তবে যে সংকেত কে মানুষ হাজার হাজার বছর আগে ছেড়ে দিয়ে এসেছে মনের ভাব প্রকাশের জন্য ভাষা, গলার স্বর, শব্দ, বাক্য ---তারপর কি আবার সেই পিছন দিকে ফিরে যাবে? আমার মনে হয় না। কারণ এই সংকেত ব্যবহার করে করে যদি অনেক কিছু বলাকে সংক্ষিপ্ত করণ করতে চাইছি তাতে তো অসুবিধা। মানে কবিতাটি লিখে তার বর্ণনা করার দায়িত্বও রয়ে যাচ্ছে।কারন এমন তো না আমি লিখছি,পাঠক বুঝুক আমার দায়িত্ব নেই বলে হাত পা ঝেড়ে বসে থাকাও দায়।

কী জানি!! হয়তো আগামীরও পরের কোনো প্রজন্ম বুঝবে।

কবিতায় সহজবোধ্যতা, মনন আর একটু মেধা থাকতেই হবে। এই মেধাই বোধ হয় অন্য কবির থেকে নিজেকে আলাদা করতে বা নিজস্বতা তৈরী করতে সাহায্য করবে।

আমার ভাবনাটুকু শেয়ার করলাম। রাগ রোষ তৈরী করা বা নিজের ঢাক পেটানোর উদ্দেশ্য কিছু নেই।

ভালো থাকুন। কবিতায় থাকুন....

                               (সম্পাদক : সাপ্তাহিক ব্ল্যাকহোল)
                        _____________________