Showing posts with label 'দহর' নবম সংখ্যা. Show all posts
Showing posts with label 'দহর' নবম সংখ্যা. Show all posts

May 26, 2019

দহর নবম সংখ্যা





সম্পাদকীয়

প্রতিটা মানুষের মনই একটা পরিযায়ী কার্নিশের ধারে বাস করে, সেখানে রোদ বৃষ্টির ছলাকলায় ভরে থাকে আগামীর হাতছানি। কবির কলমে ঘনিয়ে ওঠে--জেগে থাকা বজরায় ধারাবাহিক বর্ষার গুপ্তজন্ম কিংবা হামা দেয় ঘুমন্ত অক্ষর যখন কালো টিপ লুকিয়ে তাকায় আয়নার কোণ থেকে। আমরা তখন অচিরেই মুগ্ধ হয়ে পড়ি। মুগ্ধতাও আসলে এক ধরনের মৌনতা,  যখন মৌনমুখর চৌম্বকক্ষেত্রগুলো ইশারায় হাতছানি দেয় অথচ একটু দখিনা বাতাস দুটি হাতের  মাঝে ঋতুবদলের গল্প হয়ে উঠে হরিয়ালী সন্ধ্যায় ভরে ওঠে নিজস্ব বাগান তখন সেই সৃষ্টি অবশ্যই হয়ে পড়ে সার্বজনীন।

এবার আমাদের  এই সংখ্যা সম্পূর্ণরূপে নারীদের কলমকেই স্বাগত জানিয়েছিল। যদিও সৃষ্টির কোনো প্রান্তেই 'দহর' লিঙ্গভেদকে প্রশ্রয় দেয় না, তবুও মেঘের আঁচলে যখন রামধনু রং উঁকি দ্যায় তখন সেই রঙের অমলিন স্পর্শ মানুষের পরিযায়ী মনের কার্নিশ বেয়ে সাহিত্যের পাতায় চিরস্থায়ী আসন লাভ করে এই কথা বলাই বাহুল্য। এই কথাটাই বর্তমান সংখ্যার প্রত্যেক কবি তাঁদের প্রতিটা অক্ষরে ফুটিয়ে তুলেছেন। যেখানে আজও একটা বেওয়ারিশ মেঘের খুনের জন্য দায়ি থেকে যায় ঘর্মাক্ত শরীর সেখানে শুধু নিজেদের কথায় পাঠকমনকে ভারাক্রান্ত না করে কলম হয়ে উঠেছে সর্বসাধারণের। তাই বোধহয় আজকের উত্তর আধুনিক একজন কবির কণ্ঠস্বরে আমরা পেয়ে যায় এক আশ্চর্য বলিষ্ঠতা; যে বলিষ্ঠতা বলতে পারে, সে আজও আমায় গান শুনিয়ে ঘুম পাড়ায়, হাড়ের বিছানায় এঁটেল মাটির কবরে।

অক্ষর দিয়ে জীবন আঁকতে আঁকতে জীবনের চর্যাপদে কুয়াশার স্তর পরম্পরাগত ভাবে কবির কলমকে জানিয়ে রাখে যদি ভালোবাসতে দাও তবে আমি থমকে দাঁড়াব, দুদণ্ড জিরিয়ে নেব তোমার ছায়ায়, এই ছায়ায় গড়ে উঠতে পারে সুশীতল শান্তির নীড়। শিরদাঁড়ার অন্তর্লীন সরসতা বাঙ্ময় হলে হিসেবের ফেরিঘাট দিয়ে ঘরে ফেরা চলন্ত কম্পার্টমেন্ট জানে বিয়োগে যোগফলের নানারকম সন্ধি। আর জানে বলেই প্রখর গ্রীষ্মের উত্তাপকে লণ্ডভণ্ড করেও বেঁচে থাকে কবিতার পঙক্তিগুলো। এই সংখ্যার প্রত্যেকটি কবিতার অন্তরে অন্তরে এমন সন্ধির বার্তা আমরা আপনাদের সামনে উপস্থাপন করতে পেরে অবশ্যই গর্বিত। আমরা ধন্যবাদ জানাই এই সংখ্যার সমস্ত কবিদের। তাঁদের লেখনীগুণে পরিপুষ্ট আমাদের এই সংখ্যাটা। প্রসঙ্গত, আর একটা কথা অবশ্যই স্মর্তব্য, আজ বিদ্রোহী কবি নজরুল ইসলামের জন্মদিবস। মহান এই দিনটিকে শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতায় স্মরণে রেখে 'দহরে'র এই সংখ্যাটাকে পাঠকদের দরবারে উন্মুক্ত করা হলো।


২৬.০৫.২০১৯                  ভালোবাসাসহ ধন্যবাদান্তে
শান্তিপুর, নদীয়া                   সম্পাদকদ্বয়, দহর
                                                



মন্দিরা ঘোষ





কবি মন্দিরা ঘোষের পাঁচটি কবিতা :


 চিল্ড বিয়ার

গতানুগতিক ব্যস্ততার  অভিমুখ
ইউটার্ন নিলে
ব্যক্তিগত কবরে উড়ে বসে
স্যান্ডপাইপারের বিকেল
শর্তাধীন স্বাধীনতায় ট্যাটুর রঙটি কান্নার
টাইট শেডিউল ভেঙে  চ্যাটের
অ্যালকালাইন স্নান
ক্লিপবোর্ডে গেঁথে নিই চিল্ড বিয়ারের সান্নিধ্য
অথচ একটু দখিনা বাতাস দুটি হাতের  মাঝে
ঋতুবদলের গল্প হয়ে উঠলে
হরিয়ালী সন্ধ্যায় ভরে ওঠে নিজস্ব বাগান



টিক মার্ক

এভাবেই কী নিঃস্ব হওয়া যায়!
একটা  লম্বা পাটাতনে পা রেখেছে
বুনো স্বপ্নের দল
বুকের ভেতর জারুল ফুলের বৃষ্টি
ঝরছেই

সেই যেদিন
একটি  হাতের ভেতর
আরো একটি  হাত নির্ভরতা বুনছিল
আর অন্ধকারের  গর্ভ ছিঁড়ে
সবুজ পদ্যরা

শিশিরের ভবিতব্য
আঁকছিল বিপ্লবী ঠোঁটে
শূন্যতার সূচিতে টিক মার্ক দিয়ে যাচ্ছি কেবল



ভিকট্রি স্ট্যান্ড

কতটা ভালোবাসো এমন অবাধ্য প্রশ্ন নয়
জানি আজকাল দোয়াতে আর কালি বিক্রি নেই
কলম ধুয়ে মুছে রাখার রোদ আর
বারান্দা চেনে না
তবু বিনিময়ের নিজস্ব জানলা দিয়ে
ঢুকে  পড়ে আকাশ
রাজ অনুচরের  অদৃশ্য ট্রিগার
উড়ে যাওয়া ডানাকে লক্ষ্য করেই
তাই কিছুই শোননি তুমি
ফাঁকা রাজপথের চোখ সেদিনের মতই সজাগ এখন
ভুল করেও তোমার উদাসীন  চোখ
যদি নেমে আসে  অবাধ্য ঠোঁটের চাহিদায়
বরং  ধরা যাক  আনুগত্যের  হাত
দুহাতের মাঝে কাৎ হয়ে থাকা সময়শরীর
শিরা উপশিরায় ব্যর্থ বিপ্লবের পদধ্বনি
সমস্ত স্রোতের টান কোন অনিশ্চিত
ধোঁয়াপাথরের দিকে
তোমার নিজস্ব আনুগত্যের পালকটি
উড়িয়ে দাও নির্ধারিতের কাছে
বদলের চাকা খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে
ঠিক হেঁটে যাবে ভিকট্রি স্ট্যান্ডের দিকে



মোহনাঘর

পারবে কি  ফিরিয়ে দিতে
সেই শাল ফুলের আকাশ কিংবা
একলা বাসস্টপে দাঁড়িয়ে থাকা
ক্যালাইডোস্কোপিক  নির্জনতা !
বেনাগাল  হাওয়ায় আলুথালু   দুপুর
কালভার্টের  কাছে দাঁড়িয়ে
অর্ধেক জীবন
পাতার গানে শিষ দ্যায় বুকের মাধবীলতা
একটা লং ড্রাইভের স্বপ্ন ভাসিয়ে রাখে
উড়ো জাহাজের ডানা
ভোরের শেষ স্বপ্নটির ক্যালিগ্রাফি
কোরাল রীফের মগ্নতা ভাঙছে
ঝিনুক রং  তুলে রেখেছি কান্নার বিপরীতে
এরপর একটি সমতল সংগ্রাম বয়ে যাবে
মোহনাঘর পর্যন্ত



মিথুন আলোয়

বুকের ভেতর ভাঙা সিঁড়ি
ঘড় ঘড় শব্দের টান
চেনা আঙুলের দিকে ধীরে
নেমে আসে নিজস্ব রতির আঁধার
মিথুন আলোয় ভাসে
হতাশ ওঠা বসা অঙ্গীকার
জায়মান শূন্যে নোঙর  ফেলে
অগৌরবের আঁকিবুঁকি
একটাই বিকেল শুধু
ছিঁড়ে ছিঁড়ে পাতি
তোমার খিদের ঝিল্লিতে
নেভানো বশংবদ

______________


সায়ন্তনী হোড়





কবি সায়ন্তনী হোড়ের কবিতা :

মুহূর্ত ও সংলগ্নতা
               
১.
ঠোঁটের উপর গেঁথে দেওয়া শব্দেরা
ধীরে  ধীরে বাষ্পীভূত হচ্ছে

যেভাবে তুমি বাসি বিছানায় প্রতিদিন সুড়ঙ্গ খোঁজো
ঠিক সেভাবেই একটা ক্ষয়ে যাওয়া সময়ের মধ্যে

আমি নিজের ছায়া কে খুঁজি

এভাবে একটা মোচড়ানো রাত কেটে যায় নিমেষেই,
আর তারপর দীর্ঘশ্বাস পেরিয়ে ক্যানভাসের ছবিদের গভীরতা মাপতে থাকি

২.
অন্ধকারের আঁচড়ে ফেলছো
গায়ে লেগে থাকা সব বিষাক্ত কথাদের ,
এভাবে কেউ কোনোদিন বিষন্নতা কে
উল্টে দেখেনি

জ্বরের তাপমাত্রা কে ও গচ্ছিত  রেখেছি
আমাদের দীর্ঘ চুম্বনের কাছে  ,
শুধু সংকেত যুক্ত কিছু মুহূর্তদের
বুনে যাচ্ছি মাঠের শেষ প্রান্ত ধরে

একটা আধখাওয়া সন্ধ্যে
অবশিষ্ট তারাদের সৌন্দর্য উপভোগ
করতে করতে
নরম বালিশের তুলোদের ঘেঁটে দেখছে

৩.
রিডের গা বেয়ে উঠে আসুক
পাশ্চাত্যের কারুকার্য ।
              নকশা কাটা জানালা ।

ক্রমে ক্রমে  জাপসা হচ্ছে একটা শরীর
 
রঙিন ভোরের গায়ে ছোপ ছোপ
কালচে দাগ  লেগে থাকে ,
যেখানে আজও একটা বেওয়ারিশ মেঘের খুনের জন্য দায়ি থেকে যায় ঘর্মাক্ত শরীর


 ৪.
কখনও কখনও  শাওয়ারের নীচে
চোখেরা  গোলক হয়ে যায় ।

জলের নিম্ন আদালতে বহুদিন
কোনো শুনানি হয়নি
কারণ
আজকাল পৌরুষ আয়ু নিমজ্জিত থাকে
অন্ধকারের বুকের ভিতর

শুধুমাত্র স্নানঘরে-ই জমা থাক  সব
অভিযোগের খোলস ,
আর বাকি অংশ বিচ্ছিন্ন ভাবে পড়ে থাকুক
বন্ধ ঘরের আনাচে-কোণাচে

একটা রক্তশূন্য সমীকরণ   .. .
      
৫.
কতটা আদর চুঁয়ে পড়লে
আয়নার প্রতিবিম্বরা অশরীরী হয়ে যায় তা জানা নেই ,
তবে ঘড়ির কাঁটার মধ্যেই লুকানো থাকে
সহবাসের  ইক্যুয়েশন

মধ্যরাতের আর্তনাদ ।   শিরা ছিঁড়ে বেরিয়ে আসছে ফোঁটা ফোঁটা রস ।

ঋতু বদলে গেলে
জন্মনিরোধকের প্রয়োগ  মিথ্যে হয়ে যায় ,

আর কয়েকটা হূক লাগানো বাকি
এরপর ই ক্লিনশেভ কাগজের উপর
  যৌনগন্ধ প্রকট হয়ে উঠবে

______________

সুপ্রীতি বর্মন






কবি সুপ্রীতি বর্মনের পাঁচটি কবিতা :


উপঢৌকন

বটের ঝুড়ি নৈঃশব্দ দুঃখ মনের কোণে চাপা ক্ষোভ,
ধৈর্যের সমস্ত বাঁধ ভেঙে অপদার্থের জরাতুর শোক।
আবদ্ধ স্বর্নালী সোপানের সম্পর্ক আড়িভাব, আজ তোমার জন্মদিন।
অগোছালো বইয়ের ভাঁজে চেনা আরশির স্বর্গসুখ আমার প্রেমিকা।
গটমট করে অন্তর্হিত সুসময় বন্ধ ঘড়ির কাঁটা অহেতুক হিসেব কষা।
অহেতুক চিল্লিয়ে অতল নিমজ্জিত ইচ্ছানদীর ঐকান্তিক আবদার।
সামর্থ্যের ঘেরাটোপে থরথর ভূকম্পন আমার চাই নতুন ঘড়ি।
ধ্রুবসত্য প্রেম আমার আলুথালু প্রেমিকার কেশ,
তবুও জিহ্বার তলায় রসস্রোত নাব্যতা হারিয়ে সরানি।
পলিমাটির জড়তায় জারিত শুদ্ধ প্রেম,
তোমার মনে ভাসে আমার দেওয়া মেঘহীন চুমু।
হামলে চলা হোঁচটপ্রবন পরিস্থিতি প্রেমিকের কোমরের জোর।
তলানিতে ঠেকে মৃতপ্রায় অস্তিত্ব তবুও ঘুণধরা দেওয়ালে সময়ের তাগাদা।
চাতাল সম বুকের তক্তায় নামলো উষ্ণ প্রসবন,
দূর আলাপনে ঐকান্তিক আবদার তোমার কন্ঠধারায়।
সুযোগ বুঝে পাল তোলা ওৎ পেতে সংগ্রহ শব্দঘরের চৌকাঠে।
উচ্ছ্বাসের স্রোত তোমার দেওয়া সময়ের সার সংক্ষেপ,
আমার উপঢৌকন নতুন ঘড়ি।



কংক্রিট

প্রতিষ্ঠিত কংক্রিটে উচ্ছন্নে চন্ডালিকা জোয়ার
অহংসৌম্যকান্তি দুরন্ত অশ্বদৌড় অট্টালিকা
বয়োবৃদ্ধ বটের বলিরেখা
অভিজ্ঞতার দীর্ঘমেয়াদী মলাট।।
মুমূর্ষু যৌবন অজন্মা সুযোগের উৎকন্ঠায়
হাত ফসকে মৃতপ্রায় চোরাবালি।।

ধূলোময় কানাকড়ি কিঞ্চিৎ সম্বল,
তবুও অগ্রাহ্য উত্থানে আগোল খুলে দেদার প্রেমে
বিস্তীর্ণ প্রাঙ্গণে ঢলাঢলি।।

ভিক্ষুক জরা আঁচল অন্ধ বৈরাগ্যে ঠনঠন থালা অযাচিত প্রেম
স্মৃতিগন্ধে ভাতের মাড়, ফুটন্ত কোকনদে প্রাজ্ঞ ফাটা চাল
আঁকড়ানো তবুও পড়িমরি উন্নতির আকর্ষ কলমিলতা
পেঁয়াজ কটূক্তির ঝাঁঝে গুচ্ছমূলে হাতড়ানো কৈশোর
অপ্রচলিত তবে কি যুবতি তুমি অতীতহীনা।।

নিরুদ্দেশ এখন ফাটা চাতাল তারুণ্যের নৈরাশ্যের হাহাকার
আধবোজা স্বয়ংক্রিয় প্রতিভা উঠা উঠা
এখন ভ্রূণ অঙ্কুরোদ্গম।।
বটের বাকলে বিধ্বংসী সৃষ্টিকথন রহস্যে বিদীর্ণ
প্রসবপ্রসূত উত্তরাধিকার দাপট শব্দসাঁকো
বন্ধ্যাত্ব এখন প্রাককথন।।



অনামী লেখক

অশ্রুসম পাষাণপ্রস্তর জমাট শোক, ক্ষুধার্ত স্বপ্নের দিশা।
মুখে চোখে নেই কোন ক্লান্তি, গভীর রাতে ছটফট ঘুম ভাঙে।
রমরমা অট্টালিকার মাঝে ব্যর্থতার অভিমান দুরস্ত ঢেউ,
চাদরে আপাদমস্তক ঢেকে লজ্জাবতী মৌন বিদ্বান,
অল্পবিদ্যা ভয়ংকরীর দলে শোষণে দিনরাত বেকারের ধাক্কার জড়তা।
পেশাদারিত্বের রোষানলে প্রকৃত জ্ঞান শুধু গোগ্রাসে গলাধঃকরন।
প্রকৃত চেতনাশূন্যতায় মাথা খুটে অন্ধত্ব মানবিকতার অপমৃত্যু।
উদাসীন শরীরে পোড়া অবশিষ্ট কর্মময় যৌবনের দাগ।
কপট শিক্ষিত লাভের গুড়ে মুখ গুঁজে বিদ্যাকে ঠেলে একপাশে।
স্বভাবদোষে বই তোমাকে ছাড়তে না পেরে, লিখতে থেকে হয়েছি আমি অনামী লেখক।
উর্দ্ধগামী দৌরাত্ম্যে শিক্ষা তোমার প্রকৃত অর্থ গেছিলাম ভুলে।
আজ নব দিগন্তের উন্মোচনে, সাহিত্য তোমাতে জীবন পেলাম খুঁজে।



হিজড়ে সুন্দরী

হিজড়ে সুন্দরী অনাগত অতিথি, আজ তোমার দ্বারে,
নৃত্য গীতে গা ভাসাভাসি হিন্দোল, মাথাচাড়া আবদার পকেট কেটে গড়ের মাঠ।
হৈ চৈ শোরগোল অট্টহাসি দীর্ঘশ্বাস অন্তরে লুকায়, কেটেকুটে ছিনিয়ে ঠিকুজী কুষ্ঠী পিতৃপরিচয়।
 অবুঝ কচি আগামী প্রজন্ম কাঁখে আলোকময়ী নাচন।বাঁধনছাড়া উন্মাদ আবদার প্রত্যাশা পারদ ছোঁয়া আকাশ, হুড়মুড়িয়ে গঙ্গাপ্রাপ্তি নৈব নৈব চ।
কোমর বেঁধে সমরে অগ্রগামী বৃহন্নলা, লাস্যময়ী অবাক করতালি শাব্দিক ছন্দগীতে।
 তুমি লজ্জা ঘেন্নার পিচ, রস পানে ভিজিয়ে অধরা ওষ্ঠ, চু কিত কিত আলোর নাচন।
খোলা হাওয়া গৃহবাসীর অবাধ উন্মুক্ত দ্বার,
ভ্রমিল কালো ভ্রমর চুষে চেটেপুটে ক্লেশ মধু,
ঝপাৎ করে চিল শকুনের শ্যেণদৃষ্টি,
খপাৎ শিকার নীরব দর্শক পিতা নির্বিকার।



নৈশিল মাদকতা

নিশীথকালে অবসাদের শ্যাওলা ভরা জলাজঙ্গম।
গভীর বিনুনী এলিয়ে দাড়িয়ে শাপলা সরসী।
অগভীর সমুদ্রের প্রতীক্ষায়, ভাসবে বলে খাদের গহ্বরে।
অঙ্গুলীচারনায় হিসেবী বিপনী গুনে গুনে শোধ তোলা।
কতটা গেল কতটা এল, হে কাপালিক, একবার থামো না।
সকল অনিষ্টের কালসর্প সযত্নে সিন্দুকে জমা করে,
উপরিপাওনা যাঁতাকলের পেষণে অমৃত।
শয্যায় আপাদমাথা চুলে চুলে কবেকার নিশার নৈশিল মাদকতা।
শ্যাম্পেনে জলসায় জলঘোলা আমি গৃহস্ত্রী।
নিরাকার ঔদাসীন্য তোমার শহুরে হাবভাব।
এলোচুলের লটে কতকাল পড়েনি যত্নের হাত।
উসকোখুসকো উদ্ভাবনী প্রেম ঊর্ণাজাল বোনে,
খোলাচুলে তোমাকে লাগে বেশ ভালো।

________________

অনুরূপা পালচৌধুরী





কবি অনুরূপা পালচৌধুরীর পাঁচটি কবিতা :


ডুয়াল ছবিঘর

ভাজ্য অসুখের ভাজক : আগন্তুক ভাগের জানলায়
বেপোট বৃত্তের উদ্বিগ্ন লাল মাংসেরঢিপী
মিলিয়ে যাচ্ছে নিরলস টগরের শ্বেতাঙ্গ খিড়কির ফলন
১পা দাও____
আগুয়ান আগুনের প্রতিচ্ছায়ায় ম্যারিনেটিং আলোর ধর্ষণ
সারি সারি হাতের দালান বেয়ে
এক একেকটা চোখক্ষেতের টহলদারি ব্যালটবাষ্পে
খসে পড়ছে আঙুলের তুলসীডগা
ক্রমশ: জিভের বাম পাশে
আমি এক দাগ হয়ে বেঁচে থাকি কামড়ের কোলাহলে



১টা শ্যাওলারুট ও টেপরুম

খরপুকুর পাকানো শেফিল্ড ঘুম ফাটছে
এলোমেলো মেরুতল : কামরার ম্যাক্সিখোদা
২য় মরুবীর্যের তরল উপত্যকায় হাঙর প্যালেস
হলুদ বালিশে অহল্যা বিনিময়
সে রাস্তারও দু'পা ___ অবারিত বারুদঘর
পরভোজী সমুদ্রের কয়েকটি দ্রাঘিমান্তর
একক ব্রেস্টেড প্রেমিক অথবা চিতলঘাসের স্বপেট

ভর্তি ভর্তি চাতুরী ভাঁড়ে দল্লা মাঘের বাফারিং গিলছে



বোবা কুয়াশার ডাইনিং জুড়ে

দুপুরের অলিগলি ছুঁয়ে নেমে আসে___
উলঙ্গ রোদখাড়ি
ভাসছে। ভাসমান নোনাপদ্মের রক্ত
গোলাপি আগুন। স্যাঁতসেঁতে আগুনের ক্যারোলিন
ঘুমন্ত মজ্জার ডেপুটি শেরিফ শরীক থ্যাঁতলানো ল্যাজ
চি বুকের চাতালে ঘ ন বসন্তটীকার ভোর হাতরে

কোয়ার্টার নিপল ড্রিংক প্রসূতি রাতের ম্যারাথন



স্পটত : অদৃশ্যমান অবজেক্ট

দেখছি ১টা শব্দ : শুনছি সময় কুঁকড়ানো টিকটিকি
সেকেন্ডের কাঁটায় ফালি ফালি মাকড়শার জলবিন্দু
১গ্লাস অন্ধকার। শাদা/কালো চিবিয়ে খাই ঘড়িঘরে
শ্বাসালো চামড়ায় বিদ্যুৎভেজা প্যারাডাইসে শব্দাক্ষ
খাগড়ার জলজ ফৌতিঘর : হুইসেলের চর্বিবাতি
কেন্দ্রবিন্দু থেকে বাষ্প উড়লে ফাঁকা মাঠে বৃষ্টি জমাই
১২টা ঘন্টা মিনিটের গোলসমুদ্রে ডুবন্ত পথে

চোখ খোলে



পেটেন্ট কুয়াশার দৃশ্যড্রপ

আকাশী বেলুন : ক্লান্ত লন্ঠনের ঠুং ঠাং
দ্যোতক গুহায় উপোষী দ্বি(পদ) চাঁদরতি
মৌচুষকি : আগন্তুক প্রহরেও দেখি ঈশ্বরীয় রূপ
(আ)কণ্ঠমগ্ন নাজুক পদ্মকোষ : অপেক্ষার ধ্বস
ঘন আলোর দাবি জমিয়ে রাখি ঋতুমতী জোনাকির জরোয়াচোখে
বাসি আতপের বকেয়া ঘুমে বিষয়ী মেঘের আবেদন
১লিপ্তরোদের বনবাসে বিনিময়ের চাঁদোয়া
যতটা গোপন বরফপিচের নিষেক হিসাব____
ঘনিয়ে ওঠে জেগে থাকা বজরায় ধারাবাহিক বর্ষার গুপ্তজন্ম

__________________

শ্যামশ্রী রায় কর্মকার





কবি শ্যামশ্রী রায় কর্মকারের পাঁচটি কবিতা :


যদি ভালোবাসতে দাও

তবে আমি থমকে দাঁড়াব
দুদণ্ড জিরিয়ে নেব তোমার ছায়ায়
নদীর পাড়ে হাত ধরাধরি করে বসে থাকব কিছুক্ষণ
চ্যাটালো নুড়ি খুঁজে ছুঁড়ে দেব জলের ওপর দিয়ে দূরে, আরও দূরে
ওরা পেরিয়ে যাবে সন্ধ্যার  মাঝি ও নোঙর
লাল নীল রূপকথা মাছ
পাহাড়ের অলীক খাঁজে দেবতার ভূম

যদি ভালোবাসতে দাও
বুকের পাথরগুলো ঝিলমিল আলো দেবে নক্ষত্রের মতো
না লেখা চিঠির কথাগুলো
প্রতিধ্বনি তুলবে পাহাড়ে, অরণ্যে, গ্যালাক্সির হু হু শূন্যতায়
এই পাংশু হেমন্তেও
তীব্র পলাশের  মতো দপদপ করে উঠবে আমার ঠোঁট
যে চেয়ারে তুমি বসে থাকো,
সোনালি  পানীয় হাতে কিছুটা নড়বড়ে
সেখানে গজিয়ে উঠবে আমাদের নৈঃশব্দের ফুল

যদি ভালোবাসতে দাও
তবে আমি আবার জন্মাব



তুমি গ্রীষ্ম হয়ে যাবে বলেছিলে

সেই থেকে গ্রীষ্ম এলেই
রূপসী রোদ্দুর খুলে লিখে ফেলি নিজস্ব ঘোর
অকারণ শুয়ে থাকি নদীর কোমরবন্ধে
নিষিদ্ধ  দড়ির সাঁকোটিতে
সাঁকো দোলে, দোল খাই বিপজ্জনক
ছায়াপথ থেকে  আসা দু একটা চোরকাঁটা
পোশাকে জড়িয়ে থাকে উদাসীন মতো

তোমাকে পেয়েছি ভাবতেই
আচমকা হয়ে যাও ডিসেম্বরের শীতে নিঃসঙ্গ  খামার
আমিও নির্জন হয়ে ঠায় বসে থাকি
বিরাট গাছের নিচে  পড়ে থাকে কতিপয়  বাক্সবাদাম
একেকটি বাক্স খুলতেই ঝিকমিক করে ওঠে
আমাদের অক্ষরশ্যামল মাঠ, ঘরবাড়ি,মায়াবী কার্ণিশ
কোনো কোনো  বাক্স থেকে
খামারে ছড়িয়ে যায় কবেকার ঢেউভাঙা হাসির গমক
কোনোটায় ভরা থাকে
আমাদের জীবনের কার্পেডিয়াম থিম
তোমার বাড়িয়ে দেওয়া সমুদ্রের মতো দুটি ঠোঁট
চুম্বনের মহাকাব্য, স্পর্শের বিদ্যুৎ চমক



ভাঙা গিটারের খোল,নীল শব্দাবলী 

যতদূর চলে গেলে
সম্পর্কের বুক থেকে পুরনো খাতার গন্ধ ওঠে
পাহাড়গঞ্জে ঠিক ততদূর হাঁটতে হাঁটতে
পেয়ে যাই চায়ের দোকান
বেঞ্চের উপর শুয়ে পড়ে থাকে বিস্তীর্ণ যুবকবেলা
কেটলি থেকে ধোঁয়া ওঠে নীরবতার

মেঘের কয়্যার থেকে সংগীত নিভে যাওয়ার আগেআগে
হাজার বছরের পুরনো গিটার বেজে ওঠে
খাদের কিনার থেকে কুড়িয়ে নিই তার আধভাঙা খোল
ভিতরে আকাঙ্ক্ষার দাগগুলি চিকমিক করে

এক কাপ চায়ের জন্য হাত বাড়াতেই
দোকানি মেয়েটি খুলে দেয় তার অজন্তা কবরী
উদ্ভিন্ন শরীর  থেকে উড়ে যায় বেগুনি পালক
ঠিক তখনি কেন যে  আলো কমে আসে রাস্তায়

নবীন তামস ভেঙে
একমুঠো তুলে রাখি নীল হাতব্যাগে
শূন্য খোলের সাথে জড়ামড়ি হয়ে যাওয়া নীল অন্ধকার

তৃষ্ণার শব্দ হয়
ব্যাগের গোপন  ঘরে ডালপালা ছাড়ে
তারপর যেমনটি হয় চিরকাল
এক সময় ফাঁক বুঝে
বুকের বাঁ পাশ বেয়ে হু হু করে ছেয়ে যায় ছত্রাকের মতো



শব্দটি পানের খিলি 

শব্দটি পানের খিলি,আভা রসে রাঙিয়েছে ঠোঁট
নিরুক্তির পাশে ওই বাজে তার আহ্লাদী ঠমক
মায়াবী, লাজুক
তার নির্জন নদীর মতো চোখ
আমি তার মনোলীনা নাম ধরে  ডাকি



ইদানীং যেরকম হয়

মেয়েটির দারুণ সুদিন
এমনটি ভেবে ভেবে দুপুরবেলায়
ঘুমের সামান্য কাছে সে-ও বসেছিল ইদানীং
ঘোরানো সিঁড়ির মতো স্বপ্নের শেষতম ধাপে
লিখে রেখেছিল তার প্রেমের সততা
তারই যুবক
ক্রমশ দূরের দিকে চলে যেতে যেতে
পথভ্রষ্ট জাহাজের মতো
নিজেকে ভিড়িয়েছিল অন্যের বন্দরে
তাদের মুহুর্মুহু বিচ্ছেদ থেকে কক্ষপথ সরিয়ে নিয়েছি
মেয়েটিও অষ্টম প্রহরে
গাঙিনীর জলে এসে ধুয়েমুছে ফেলবে বিষাদ
পাহাড়তলির হাটে বেচে দিয়ে যাবে এতদিনকার দিকশূন্যতা


__________________


সবর্না চট্টোপাধ্যায়





কবি সবর্না চট্টোপাধ্যায়ের পাঁচটি কবিতা :


ক্ষতিপূরণ

এ শুধু প্রেমের কবিতা নয়
তোমার ঠোঁটের কালসিটে দাগ
আমি যাকে তিল ভেবেছিলাম!

সূর্যাস্তে লাল সবই তো সুন্দর...

সেই কবে চোখ তুলে রেখেছিলে চোখে
তিস্তার তিরতিরে জল…
ব্যথাদের সঙ্গম ছিল
বিকেল আলোয় যেন ভুলে গেছি
‘চারদিকে তখন আকাল’....

তারপর কোন অভিশাপে
পাহাড় সাগর নদী
একসাথে ভাত রাঁধা বাকি
বাকি ফুল ছাপ শাড়ি
ছুটে গেছি ত্রস্ত কাঙাল

‘একটা যে কোন কাজ’ - তুমি চলে গেলে পায়ের
ছাপ ফেলে। দুধে আলতায় বাড়ন্ত সংসার।

এ শুধু প্রেমের কবিতা নয়।
পাঁজরের ভেতর ঢকঢক করে দেশি মদ
পায়ে ধরেছি সাধু সন্ন্যাসী। তিনটে আংটি তিথি পাঁজি…
অথচ ভুল। যে দেশ কথা রাখেনি কোনদিন

আমার মৃত্যু হোক শুধু এক ক্ষতিপূরণ!



আড়াল

কত রোদ জমে আছে আয়নার পিছনে
লুকানো লাল টিপ…
বাজার থেকে ফিরে রেখেছিলাম সযত্নে!
এখন দপদপ করছে ওয়াইফাই
বসে আছি ভজা শালিকের মতো
হোয়াটস অ্যাপে শুধু এটাওটা লিস্ট

ক্ষীর জমা দই
ফ্রিজে রাখা দুদিনের বাসি চিংড়ি…
‘আসবে আসবে’ করে ফেলা হয়নি আর!

ভেজা জুতো দুটো ছাপ ফেলে গেছে সাদা মেঝে
‘তুতুন তাতাই’ স্কুল থেকে ফিরেছে হবে!
আমি মুখ দেখি সারা দুপুর জাগার পর।
অক্ষরগুলো সংলাপ চাইছে এবার…
আমাদের বন্ধুত্ব ফিরছে ক্রমশ সবার আড়ালে!



বই

এক একটা মেঘলা দিন যেন পুরোনো বইয়ের গন্ধ।  উপুর হয়ে ঘুমায় খাতাপেন। নাল পড়া বালিশ!

ঝিমুনি আসে...

তোমায় লক্ষ ভুলের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া ছাড়া
আমি অসহায়!
সে বই বন্ধ করি জোর করে।

বাজার হেঁকে যায়। আখের রসে গড়গড়ে রোদ।
রান্নাঘরে গন্ধ আম ডাল…

মধ্যবয়সী স্তন ঢেকে রাখি।
হামা দেয় ঘুমন্ত অক্ষর। কালো টিপ লুকিয়ে তাকায় আয়নার কোণ থেকে...

কি যেন নাম দিয়েছিলে ‘বিতর্ক’!
রবীন্দ্রনাথ নাকি হুমায়ুন আহমেদ?
মিসির আলি না হিমু!
আমি থেমে গেছি বারবার ‘শেষের কবিতা’।

ঠোঁট উল্টে বলেছ ‘ মিলছে না’।
সত্যি কি মিলল তবে?

‘অমিত চেয়েছিল খাঁটি বাঙালিয়ানা’
বুঝতে পারেনি তবু, একঘর পুরোনো বইয়ের গন্ধতে
ঘুম আসে মধ্যবিত্ত মেয়ের ।



কি জানি কতদিন পর

কি জানি কতদিন
একা আমার মতো...
ছায়া নেই। রাশি রাশি গাছ…
চেনা চেনা লাগে ।
একে একে পার হয়ে যায় স্টেশনের নাম।
সতর্ক বসি।

ওদিকে হকার চেঁচায়, “বাদাম বাদাম”
কত প্রসাধন...
কাঁচা আমলকি…লোভ হয়!
ছোটবেলায় বড়দিদি শুকোতে দিত রোদে...
আরও একটা স্টেশন পেরিয়ে যায়।

নালা আর বাড়ি মিশে আছে
কাঁপছে ঝুপরি দোকান।
কোথাও রেলগেটে ব্যস্ত মানুষ
হয়ত দেরী হয়ে গেছে। পৌঁছতে শেষবার…
সতর্ক বসি ।

পথ এগিয়ে আসে…
যেতে হবে। ঠিকানা জেনে নিতে হবে
তোমায় ছাড়া এত বছর পর...

ট্রেনের বুড়ো হকার...
আমি পিছু নিই যেভাবে সে পেরিয়ে যাচ্ছে
এক নম্বর প্ল্যাটফর্ম



ঝড়

হেঁটে যাচ্ছে বিমর্ষ এক সকাল
ভাঙা ছাতার গা বেয়ে নামছে কত মৃত্যু
ঝড়ের প'রে বাসাহীন ব্যাঙের ডাক
কোনদিন ভোরকে এভাবে, রাত মনে হয়নি আগে!

সামনের ঝুপড়ি উড়ে গেছে। উদ্বাস্তু সন্ধ্যের হাওয়া
গা ছমছমে ভূতের মতো এখনও ঝুলছে ছেঁড়া পর্দায়….

চারটে গরু সারারাত কেঁদেছে
আর খুরের নীচে জমেছে পাখির পালক!
আমি দেখেছি জানলা দিয়ে….

যতবার ফুঁসেছে বাতাস ভেবেছি ‘ ঠিক আছো তো’?
হয়ত এটা...হয়ত বা ওটা...‘ভিজে গেছ বোধহয়!’

যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হলে আজও কেমন ঝড় ওঠে
আড়ালে আড়ালে!


________________

মান্টি অধিকারী দত্ত





কবি মান্টি অধিকারী দত্ত'র পাঁচটি কবিতা :



পরিবর্তন

এসো, মৃত্যুর মুখোমুখি বসি,

উষ্ণ খাদে এখন মাঘ মাস,

      মন সেদ্ধ ভোরে

    মেঘ মাটি না ছুঁলে

   নতুন বসন্ত আসে না,

তাই ব্যবচ্ছেদের আগে

 শবের নৈঃশব্দ্যে

     অজস্র  লাশ,

এসো, অসুখের বুক খুঁড়ি,

মাংসাশী জিভে গেঁথে দিই

  সহস্র কচি সবুজ ঘাস ।



চাহিদা

কিছু জন্ম ইতিহাস ভুলে যায়

পুনরায় জন্মের তাগিদে;

কিছু মৃত্যু ঢাকা পড়ে যায়

আচমকা রোদ্দুরে;

ক্ষীণ অস্তিত্ব ছুটে ছুটে

যায় ক্ষণিকের স্বর্গে ,

প্রতিটা জন্ম কুরে কুরে খায়

  গহীন থেকে গর্ভে ।



শহর

এ শহর বৃষ্টি বাতাসে

মাটির সোঁদা গন্ধ মাখে না,

মৃত্যু লোকানো বুকে খাঁচে

প্রজাপতিরা আর আসে না,

    এখন  আত্মার গায়ে

       মাংসের পচা গন্ধ

কালসিটে নিকটিনে

মাতলা নদীর মাতাল ছন্দ ,

এ শহর বিষন্নতার বাঁকে

  বেদনার সুর বাঁধে না,

  এ শহরে

  পলাশের যান্ত্রিক সুখে

  বসন্তের গন্ধ আসে না।



শব্দের জননী

তুমি বৃষ্টি ছিলে

ফাগুন জাপটে

মুষড়ে পড়তে

কাঠফাটা রোদ্দুরে;

নৈসর্গিক সীমান্ত পেরলে

পৌঁছে যেতাম

সেই পরিমিতির পরিসরে;

শুনতে পেতাম

শব্দ বীজের অঙ্কুরোদগম,

 কুন্তী কখনওবা তুমি গঙ্গা!

তুমি মহীরুহ ।

আগুন-চোখে পুড়িয়েছো আকাশ,

নিস্তব্ধ আর্তনাদে রাতে শরীরের বিষাক্ত

নোনা সমুদ্র স্বাদে তোমার শব্দের পরাগায়ন;

তুমি বাক্। কবিদের জায়া ও জননী।




মুক্তি

 নখের ত্বকে

ক্ষুধার্তের অসম শক্তি

 স্বীকৃতির শিকড়ে

 অনুচ্চারিত স্বীকারোক্তি!

 মাটির খুঁড়ে জল

 জলের তীক্ষ্ণ কোলাহল

 
আজ আর বৃষ্টি নয়...

আগুনেই হোক ফুলের মুক্তি!

                   -----------------------------

দীপান্বিতা সরকার





কবি দীপান্বিতা সরকারের চারটি কবিতা :

চাকা

মানুষ আর মারা গেছে  কবে?
চামড়াটাই তো শুধু হয়েছে ন্যাতানো ছাই
চোখের আড়ালে সব।

মারা গেছে বললেই কি আর চলে যাওয়া যায়!
মিশে থাকে ঘাম, রক্ত, সৌখিনতা, স্নেহ-আতর
রোজনামচার প্রতিটা জামায়।
আলজিহ্বা চিড়ে ছুটে আসে অস্তিত্বের কাশি,
মারা গ্যাছে বলে কি আর আগের মতন ভালো না বাসি!
আগলিয়ে রাখা আঁতুড়ের ট্যাঙ্ক,
কত কাঁথা নকশি পাড়া দিয়ে পড়িয়ে যায় শৈশব,
গান-আঁকা-নাচ প্রতিভাত সংগ্রাম চক্রে
ফুরায় ধোঁয়াধার উৎসব।

মানুষ জন্মালেই দশের বুকে বাঁচে,
শুধু ফেলে যায় আমার যতটুকু আছে।
দেহ মরে গেলে কেনই বা চোখে জল রবে,
চামড়াটাই তো শুধু হয়েছে ন্যাতানো ছাই-

মানুষ আর মারা গেছে কবে?



ইলিউশন : রাতে ঢাকা

অত্যুষ্ণ দেশকাল মুখ হাঁ করে চায় ঝড়-ঝাপটা,
মার মার কাট কাট নয় বরঞ্চ আদুরে বাতায়ন।

তখন রাতের মহাশূন্যে বাবু হয়ে বসে চাঁদের বাটিতে আলুপোস্ত খেতে খেতে চারপাশ জলের গেলাস হয়ে ওঠে
সাদা বক ঠোঁট বরাবর ম্রিয়মাণ চাঁদে লুটিয়ে পড়ে: বিতর্ক, বাঁচবার ধ্বজা উড়িয়ে ক্লান্ত।

বাদুড় রঙা ধোঁয়া সাঁতরে বেড়ায় যেন ডিনারের শেষে সিগারেটে শান্ত ওষ্ঠধার।
কিসব আঁকিবুঁকি! থম মেরে চুল আঁচড়ায় বিভূতিভূষণ,
জেলিফিশ আর বল্গাহরিণ, সমুদ্র আর সমতল এক হয়ে মিশে যায় গালে:
আসমুদ্রহিমাচল এলোপাথাড়ি বিভীষিকাময় ক্ষুধার্ত।

কচি পীতবর্ণের পাঞ্জাবি পড়া চোখমুখ, শিরদাঁড়াহীন যুবক, কোঁকড়ানো গোফের নীচে একফালি তারা তার তিল।
বুদ্ধিবাদ জৌলুসহীন কেউ ঘোর ভাঙেনি।
আয়না হাতে ইজি চেয়ারে কাজল আঁকে বাষট্টির নাবালিকা, দু'খানা দড়িতে কাপড় নিংড়ে জল ঝাড়ছে মা,
হিমোগ্লোবিনে ওরা একা হয়ে গর্ভবতী মা ভাবছে আর কটা দিন অধীনতামাত্র!

দেহাতি পথেঘাটে আমার চোখ ঢুলে পড়ে মিস্টার.ওয়াটের "ফরগেট নট ইয়েটের" আর্জিতে।

প্রতিটা গেছো মেয়ে সাবধানে যাস বললেই আবার দেহ খুঁড়ে কবিতা লেখার সালোকসংশ্লেষ ঘটায় মিচকে প্রেম।
দিন এভাবেই চলছে,
আর বিপ্লবে ভারসাম্য নেই: সত্যি বলার শক্তি,
সংযম ক্ষীণ

অতএব ধৃতরাষ্ট্র হয়ে ঘুমিয়ে পড়ুক নগরকীর্তন।।



মার্চ জলোচ্ছ্বাস ও এড়ি দমন

মার্চ মাস গোটা এক মারণ ব্যাধি,
ঝাঁঝরা করে দেয় চলে যাওয়ার নোটিশ কেমোথেরাপি;
গরমকাল তখন সদ্য সুতির পাজামা পড়তে শিখেছে।
ভীড় ট্রেন হোক বা ফুটিফাটা মেঘের ইফতারে-
এখনের মতন ওড়নায় নোনতা ঘামের নেমপ্লেট এঁটে দিতে পটু নই,
গেলাস গেলাস সরবত গেয়ে ওঠে ট্যাঙ্কের আলগা ফ্রাই জলে,
শাওয়ার থেকে আমার খোলা কাঁধে পুড়ে যায় অভিশাপ।
আমি ঠ্যাটার মতো ঢোক গিলতে গিলতে ভিজে যাই মার্চে,
না বৃষ্টি হয়নি শেষমেশ, আমি সুদৃঢ় বুকে মাথা রেখে শুনেছি-
আমি তো রইলামই তোমার প্রতিটা প্রাক্-বৈশাখে।
দেশ বিদেশে সেটেলড্, সিম থেকে শোনা যেত "আপনি যাকে ফোন করেছেন তিনি এখন ব্যস্ত আছেন স্বেচ্ছায়"...
তবুও তো শোনা যেত! বাতিলের খাত বুঝি না।
এখনও রাস্তার দুধারে বকুলের মেলা সাজে,
শুধু কিছুটা সময় ভালো খাবারের স্বাদে আঙুল চাটার বিশ্রী দৃশ্য দেখা যায় না,
একগাদা বেল ফুলের বার্তা বাহক হতে আমি আবারও রাজি ,
কেবল তোমার পায়ের চাপে আলগা মন-মাটিজমি দমে যায় না আর...



ভূমিকন্যা

যার জন্যে ফ্রেমে ফ্রেমে কবিতা বেঁধেছি,
যার প্রিয় পোড়া মাটির ভাঁড়ে
আমার ঠোঁট শুষেছে সহস্র যুগের আর্তনাদ,
কিছুটা সময় কেটেছে,
ঝিঁঝিপোকাদের মহড়ায়, চাদরমুড়ির রাতে,
বয়সের ভারে নুঁয়ে পড়া ম্লান আলোয়
শব্দহীন চাঁদের সাথে গল্পেতে।
সেখানেই জুতোর পরিসর আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে,
যে শেকড়বিহীন বটবৃক্ষের কোটর
পেঁচানির চিৎকারে কানপেতে ক্যাকটাসের কাঁধে,
আটকে ধরে বন্দি করেছিল আমায়
ওই মায়ের জঠরে,
সে আজও আমায় গান শুনিয়ে ঘুম পাড়ায়,
হাড়ের বিছানায় এঁটেল মাটির কবরে..

______________